"শহীদ মশিয়ুর রহমান"
স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিঝরা সূর্য সৈনিক

যার বীর বীর্য তুর্জ্জে গর্জ্জে। যার সিংহনাদে বাঘ্র হুঙ্কারে কেঁপে উঠেছিল পাক শাসক। যার বহ্নি বিনায় বেজে উঠেছিল বিজয়ের বাদ্যবিনা। যার রক্ত ঘ্রান আজো মেখে আছে সবুজ পতাকার লাল টকটকে সূর্যে। যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সহচর, স্নেহভাজন ব্যক্তিত্ব, তিনিই হলের চৌগাছার অন্যতম তেজ বীর্যবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ মশিউর রহমান। এই মহান বীর শহীদ মশিউর রহমান ১৯১৭ সালে ফেব্র“য়ারী মাসে চৌগাছার সিংহঝুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম ইসমাঈল হোসেন বিশ্বাস, মাতার নাম ছৈয়দুন্নেছা। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় তার পিতা মরহুম ইসমাঈলের কাছে। মা ছৈয়দুন্নেছাও সে সময় লেখাপড়া জানা মহিলা। ছেলেকে নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় বারান্দায় পড়াশোনায় বসাতেন। দুরন্ত দূর্বার প্রত্যহ হুষ্ট পুষ্ট ছেলে মশিয়ুর অকুতোভয়, ডানপিঠে, খেলাধুলায় দুরান্ত, গায়ের ছেলেদের সঙ্গে মিলমিতালী, কখনো রাখাল ছেলেদের সঙ্গে বাশির সুর শুনে বিমুগ্ধ হয়ে পড়তেন। আবেগ উচ্ছাস আর ভালবাসার বিরল কিশোর ভাবতেন সমাজ নিয়ে, জাতি নিয়ে, দেশ নিয়ে। পিতা ইসমাঈল হোসেন ছেলেকে চৌগাছা ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করলেন। সেখানে থেকে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন শহীদ মশিয়ুর। তারপর এই বীর ১৯৩৮ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে এস, এস, সি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তারপর শহীদ মশিয়ুর রহমান উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় রওনা হলেন। সেখানে ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৩৮ সালে এইচ এস সি পাশ করেন। সাথে সাথে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে মোটামুটি একাত্বতা ঘোষনা করেন। তারপর আইন পড়ার ইচ্ছা তার মনে মনে চেপে বসে। পিতা ইসমাঈল হোসেনেরও তারপর ১৯৪০ সালে কৃতিত্বের সাথে বি, এ ডিগ্রীর্ ান করার পর ১৯৪৪ সালে কলিকাতা বিপন কলেজ থেকে এস এস বি ডিগ্রী লাভ করেন। তারপর আইন ব্যবসার সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েন। মাথায় চেপে বসে রাজনীতির বিশ্বাস সেই ভূত। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরেই শুরু হয় মশিউরের পথ চলা। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত ইংরেজদের সাথে তার ছিল দা- কুমড়ার সম্পকৃ। প্রথমে যদিও কিছুদিন ইংরেজ এক বড় সাহেবের সেক্রেটারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। ১৯৪৯ সালে যশোরে আসেন ও যশোর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩২ বছর। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সুতীব্র দূত হিসেবে কাজ করেছেন বীর শহীদ মশিয়ূর রহমান। তিনি সে সময় পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার করেছিলেন। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যশোরসহ সারাদেশে। তারই হুকুমে যশোরে রাষ্ট্রভাষার দাবীতে সুতীব্র মিছিল হয়েছিল। থমকে গিয়েছিল পাক শাষকেরা। স্তব্ধ হয়েছিল তাদের বাক। তরুন আইনজীবি বিশ্ব সভায় আইনী লড়াই চালিয়ে যাবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়া উর্দু হলে, এ প্রত্যয় আর প্রতিজ্ঞার জন্ম নিয়েছিল তার হৃদয়ে। বঙ্গবন্ধুর একজন সিনিয়র সহদর হিসেবে শহীদ মশিয়ূর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্বোধন করতেন। রাজনীতিক হিসেবে, আইনজীবি হিসেবে শহীদ মশিয়ুর রহমান ছিলেন একজন সৎ যোগ্য ও দেশ মাতৃকার অমর মহানায়ক। দেশের দূর্যোগ দূর্বিপাকে বঙ্গবন্ধুর পাশে দাড়িয়ে সমস্ত বিপদ আপদের মোকাবেলা করেছেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শহীদ মশিয়ূর রহমান যুক্তফ্রন্টের মনোনিত প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এবং প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় তিনি স্থানীয় সরকার, আইন ও বিচার বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন সিনিয়র নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও শহীদ মশিয়ূর রহমানের বন্ধুব্ব ছিল প্রগাঢ়। কেননা দুই নেতাই ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশীর্শ নেতা, দুজনেরই রাজনৈতিক হাতে খড়ি সোহরাওয়ার্দীর কাছে। আর উপমহাদেশের বৃটিশ শাষণ থেকে শুরু করে সমস্ত শাষন নির্যাতন নিপিড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার করতে এই মহান নেতা। তারই স্রোতধারায় তারই তেজস্বী অগ্নিস্ফুলিঙ্গে জমকিয়ে ওঠে চমকানো সচকিতের ত। দুই নেতা একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর একজন চৌগাছার কৃতিসন্তান শহীদ মশিয়ূর রহমান। শহীদ মশিয়ূর রহমানের জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধুর প্রত্যেক কর্মকান্ড তার সঙ্গে নিয়ে সমাধান করেছেন। আর সেটা সম্ভবপর হয়েছে এ কারণেই যে, শহীদ মশিয়ূর রহমান ছিলেন বাঙালীদের প্রথম সূর্যের প্রথম কিরণকর, প্রথম বারির সুষ্পষ্ট সুচারুভাবে পরিচালনা করেন। অন্যায় অত্যাচার অনাচার আর বিদেশী দোশরদের বৈষ্ণম্য মূলক আচরণের বিদ্রেহী অগ্নিপুরুষ ছিলেন শহীদ মশিয়ুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন তিনি। প্রত্যেক আন্দোলনে যুগবৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিদ্ধ হস্ত ছিলেন শহীদ মশিয়ুর রহমান। সাধারণ খেজে খাওয়া মানুষ। শ্রমিক মজুরদের একান্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন তিনি। সর্বহারা মানুষের দিক নির্দেশনা অতন্ত্র প্রহরী ছিলেন মশিয়ূর রহমান। পাকের ঝাকের হাকের উত্থান যখন তীব্রতর যুদ্ধের বিভৎস্য বিভিষীকা যখন এগিয়ে আসছিল তখন মশিয়ূর রহমান উত্থত জনতার কাতারে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনাকে তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। ১৯৭১ উত্তাল মার্চ শোষন আর বঞ্চনার শেষ টাইফুন পাকের শাষকদের। হত্যা ষড়যন্ত্র আর নির্যাতন ছিল দশ্যুদের প্রধান কাজ। ৩ মার্চ সেনাবাহিনীর গুলিতে যশোরের চারুবালা নিহত হলেন। বর্বরোচিত হত্যাকান্ড মেনে নিতে পারেননি শহীদ মশিয়ূর। জনতার জয়ী পুরুষ যশোরে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে চারুবালার লাশ নিয়ে সারা যশোর শহরে প্রতিবাদী মিছিল ও জনসভার আয়োজন করে। মিছিল যখন যশোর সার্কিট হাউজ ময়দানের নিকট পৌছায় তখন মিছিল থেকে সেনাবাহিনীর দিকে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে সাধারণ জনতার বাধ ভাঙা জোয়ার শহীদ মশিয়ূর রহমানের নেতৃত্বে, থামেনি মিছিল, শ্লোগান উদ্যত জনতা সেনাবাহিনীর দিকে হামলার জন্য প্রস্তুত। তখন সেনাবাহিনীর কর্ণেল তোফায়েল মিছিলে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু কর্নেল সাহেবের নির্দেশ বাস্তবায়নের আগেই মশিয়ূর রহমান সুতীব্র কর্কষস্বরে সেনাবাহিনীকে গুলি চালাতে নিষেধ করেন। থমকে যায় হায়নাসেনারা, স্তব্ধ হয়ে যায় কর্ণেলের বাক। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থানের সময় মশিয়ূর রহমান সাধারণ মানুষের কাতারে এসে যে গণ জোয়ার তুলেছিলেন তা অবিস্মরণীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার।

“ভয়হীন ডরহীন জয় ভঙ্গাবীর,
রক্তে গঙ্গায় ভাষা উচ্চ তবু শির,
মরনের স্মরনিকা চৌগাছার সূর্য,
সারা বঙ্গে সংগ্রাম, নবা তেজবীর্য,
মহাশিব মশিয়ূর অসিহীন অসি,
চলে প্রতি মার্চে, আমি ফের ফিরে আসি।

শহীদ মশিয়ূর রহমান অসীম সাহসী আর শক্তির অধিকারী ছিলেন। সাধারণ গণ মানুষের ভারশিষ্য নেতা ছিলেন তিনি। যার অবর্ণনীয় পরিশ্রম দূর্বার চিত্ত চেতা অনল বর্ষিতা। ৭০’এর সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয় এনে দেয়। বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেও ক্ষমতায় যেতে পারেননি মশিয়ূর রহমান। বিদেশী শাষকরা ক্ষমতার মসন্দ আকড়ে ধরে রাখে। জনতার উত্তাল তরঙ্গ তরাঙ্গায়িত সারা বাংলায় আওয়ামীলীগ বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে ও গদিতে বসতে পারেনি। ৭ মার্চ ৭১ বঙ্গবন্ধুর ভাষন এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। শহীদ মশিয়ূর রহমান রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ জনতার মঞ্চে যখন ভাষন দিলেন উত্থিত জনতা উত্থিত মশিয়ূর রহমান। শ্লোগানে শ্লোগানে উজানে নাও বেয়ে চলে বঙ্গের জনতা। ইট- লাঠি, ঝাটা বাড়–ন পরিশেষে জীবন নিয়ে মেতে ওঠে লাল টকটকে রক্ত চোষা ডাইনীদের চিরতরে বিতাড়িত করতে। মশিয়ূর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার পূর্ণপ্রাণ। মুক্তিযুদ্ধের বাঙালী ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাণ পুরুষ। ২৫ মার্চ ভয়াল রাত, ভয়াবহ বাঙালী জাতীয় ইতিহাসে বুদ্ধিজীবি হত্যা, ষড়যন্ত্র আর রক্ত খেলায় মেতে ওঠে বর্বর কাহিনী। সেই ভয়াল ২৫ মার্চ রাতে মশিয়ূর রহমানকে যশোর শহরের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে পাক হানাদারেরা। তারপর যশোর ক্যান্টনমেন্টে শুরু হয় পৈশাচিক অত্যাচার। অত্যাচারের যত প্রকার উপকরণ আছে তা ব্যবহার করে পাক সৈন্যরা। দীর্ঘ ১ মাস অত্যাচার করার পর হত্যা করা হয় এই বীর পুরুষকে। তারপর দীর্ঘ নয় মাস পর বিজয় ছিনিয়ে আনে বাঙালী মুক্তিযোদ্ধারা। সবাই ফিরে এলো। কেউ কেউ এলোনা কার কাল সকাল হলো, কারো নিশি পেলনা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যশোরে এলেন শহীদ মশিয়ূর রহমানের উদ্দেশ্যে স্মরণের স্মরনিকা স্বরূপ যশোর পৌর উদ্যানে ১৯৭২ সালের ২৬ ডিসেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কৃর্তক পৌর উদ্যান উদ্ধোধন করা হয়। শহীদ মশিয়ূর রহমান সারা জীবন যে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন তা ইতিহাসের স্বর্ণঅক্ষরে চিরকাল লেখা থাকবে। শহীদ মশিয়ূর রহমান যে রক্ত দিয়েছেন সে রক্তের ঋণ কোন দিন শোধ করার নয়। চৌগাছার মাটিতে জন্ম যার, যার রক্তে চৌগাছা স্বাধীনতার উজ্জল সূর্যে ভাসমান, সেই চৌগাছাতে শহীদ মশিয়ূর রহমানের আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করেছি? আসুন গুণিদের মূল্যায়ন করতে শিখি যক্তর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন “যে দেশে গুনের সমাদার করা হয় না, সে দেশে গুণি জন্মায় না”।

এসো সবাই মিলে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি আর বলি-

“মহা মশিয়ূর তুমি শাশ্বত সম্মান,
তোমার রক্তের স্রোতে, বাঙালী উত্থান,
স্বর্গের সপ্তর্ষী শিরে হোক তব: স্থান
ফিরে ফিরে এসো হে চৌগাছার সন্তান”

তথ্যসূত্রঃ

 

This free website was made using Yola.

No HTML skills required. Build your website in minutes.

Go to www.yola.com and sign up today!

Make a free website with Yola